ট্রাম্পের এক ফোনেই ফুটবলারের লাল কার্ড প্রত্যাহার! পর্দার আড়ালে যা ঘটেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক।।দ্য এক্স ট্রিবিউন

প্রকাশিত: ৬ জুলাই, ২০২৬ এ ০৫:২৫ PM0
ট্রাম্পের এক ফোনেই ফুটবলারের লাল কার্ড প্রত্যাহার! পর্দার আড়ালে যা ঘটেছে

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে বেলজিয়ামের মুখোমুখি হওয়ার আগে বড় স্বস্তি পেয়েছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। রাউন্ড অব বত্রিশে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে সরাসরি লাল কার্ড দেখা মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা আকস্মিকভাবে স্থগিত করেছে ফিফা।

ফিফার এই সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও বোদ্ধা এটিকে বিতর্কিত বলেই মনে করছেন। তবে সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, "সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এবং একটি বড় অবিচার সংশোধন করায় ফিফাকে ধন্যবাদ।"

ফিফা সভাপতিকে ট্রাম্পের ফোন?

ব্রিটিশ গণমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে ট্রাম্প নিজেই ইনফ্যান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ফিফার সিদ্ধান্ত প্রকাশের কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে সংস্থাটিকে ধন্যবাদ জানান।

এদিকে ট্রাম্পের কথিত এই হস্তক্ষেপ নিয়ে ফুটবল মহলে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অনেকে মনে করছেন, এমন পদক্ষেপ টুর্নামেন্টের ফেয়ার প্লে নীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প, বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লাটনিক এবং হোয়াইট হাউসের টাস্কফোর্স প্রধান অ্যান্ড্রু গিউলিয়ানি বালোগানের বহিষ্কারাদেশ চ্যালেঞ্জ করতে একটি আইনি দল গঠন করেছিলেন।

স্তম্ভিত ফুটবল বিশ্ব, ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম

ফিফার এই সিদ্ধান্তে বেলজিয়াম শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এক বিবৃতিতে বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) জানায়, তারা এ সিদ্ধান্তে 'স্তম্ভিত' এবং ফুটবলের ফেয়ার প্লে ও সততার নীতি রক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বেলজিয়ামের প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়াও। তিনি বলেন, "আমি জানতাম না যে বিশ্বকাপে ৫ জুলাই এখন ১ এপ্রিল হয়ে গেছে। আমরা ফুটবল এবং এর নৈতিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করছি।"

বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া বলেন, "এটি যদি আগে জানানো হতো, তাহলে হয়তো আমরা প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে নিতে পারতাম। তবে খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের লক্ষ্য অপরিবর্তিত—আমরা জয়ের জন্যই মাঠে নামব।"

বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আরও দাবি করেছে, এই সিদ্ধান্ত ফিফার নিজস্ব টুর্নামেন্ট বিধিমালার পরিপন্থী। সরাসরি লাল কার্ডের ক্ষেত্রে পরবর্তী ম্যাচে স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞার নিয়মটি টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই সব অংশগ্রহণকারী দলকে জানানো হয়েছিল।

এ বিষয়ে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

পর্দার আড়ালে কী ঘটেছিল?

ট্রাম্প যে ইনফ্যান্তিনোকে ফোন করেছিলেন—এমন খবর প্রকাশের আগেই ট্রুথ সোশ্যালে তাঁর পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা তৈরি করে। সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন বারস্টুল স্পোর্টসের প্রধান ডেভ পোর্টনয়।

ফিফার সিদ্ধান্ত ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছিলেন, "আমার সূত্র বলছে, খুব শিগগিরই একটি লাল কার্ড বাতিল হতে যাচ্ছে।"

পরে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়ার খবর প্রকাশের পর ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের একটি সম্পাদিত ছবি পোস্ট করে তিনি লেখেন, "অনেকে জানতে চাইছেন কীভাবে এই সিদ্ধান্ত হলো। একজন ভালো সাংবাদিক কখনো তার সূত্র প্রকাশ করেন না।"

জানা গেছে, মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনের আইনি দল ফিফার কাছে আবেদন করেছিল। তাদের দাবি ছিল, বালোগানকে লাল কার্ড দেখানোর আগে ভিএআরের স্লো-মোশন রিপ্লে ভুলভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল।

নিজের দায় এড়িয়ে যা বললেন যুক্তরাষ্ট্রের কোচ

ফিফার সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় ফুটবল দল জানিয়েছে, "আমরা শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই এবং বালোগান আগামী ম্যাচে খেলতে পারবে জেনে আনন্দিত। এখন আমাদের পুরো মনোযোগ বেলজিয়াম ম্যাচে।"

মার্কিন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো বলেন, "ফেডারেশন পুরো বিষয়টি দেখভাল করেছে। আমি এতে জড়িত ছিলাম না। আমি শুধু দল প্রস্তুত করার কাজ করেছি।"

তবে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, "ফুটবলের জন্য এটি ভালো যে মাঠের বাস্তবতার বাইরে স্লো-মোশনের ভিত্তিতে নেওয়া একটি ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়েছে।"

মার্কিন তারকা ক্রিস রিচার্ডস বলেন, "প্রথমে আমরা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এআইয়ের যুগে অনেক কিছুই ভুয়া হতে পারে। পরে নিশ্চিত হওয়ার পর দারুণ লেগেছে।"

বালোগান নিজেও বলেন, "ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ছিল। আমার মনে হয়, সর্বোচ্চ হলুদ কার্ড হওয়া উচিত ছিল।"

অন্যদিকে অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক বলেন, "খবরটি শুনে প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। পরে বুঝলাম এটি আমাদের জন্য দারুণ সংবাদ।"

পেছনের দরজা দিয়ে নিয়ম বদল?

ফিফার টুর্নামেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী, সরাসরি লাল কার্ডের ক্ষেত্রে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা বাধ্যতামূলক। তবে এবার ফিফার জুডিশিয়াল কমিটি শৃঙ্খলা বিধির ২৭ নম্বর ধারার বিশেষ বিধান ব্যবহার করে বালোগানের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

ফিফার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে বালোগান একই ধরনের গুরুতর অপরাধ না করলে নিষেধাজ্ঞাটি আর কার্যকর হবে না।

এর আগে পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিয়ম প্রয়োগ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

কেন লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল?

গত ১ জুলাই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমার্ধে গোল করে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে দেন ফোলারিন বালোগান। তবে ৬১তম মিনিটে বল দখলের লড়াইয়ে বসনিয়ার ডিফেন্ডার মুহারেমোভিচকে পেছন থেকে ট্যাকল করলে রেফারি ভিএআর পর্যালোচনার পর ৬৪তম মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।

চলতি বিশ্বকাপে তিন গোল করে দলের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছিলেন বালোগান। ফলে তাঁর নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ফিফার সিদ্ধান্তে তিনি বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ পান, যা পুরো ফুটবল বিশ্বে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এই খবরটি শেয়ার করুন: