জাতীয় সংসদে পাস ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, ১ জুলাই থেকে কার্যকর

নিজস্ব প্রতিবেদক।।দ্য এক্স ট্রিবিউন

প্রকাশিত: ৬ জুলাই, ২০২৬ এ ০৪:৪৩ PM0
জাতীয় সংসদে পাস ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, ১ জুলাই থেকে কার্যকর

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সংসদ অধিবেশনে নির্দিষ্টকরণ বিল, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে নতুন অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়। আগামী ১ জুলাই থেকে বাজেটটি কার্যকর হবে।

এর আগে সোমবার সংসদে অর্থ বিল, ২০২৬ পাস হয়। এতে করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনে ভ্যাট কমানোসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬৪টি সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপন করেন। এবারের বাজেটের প্রতিপাদ্য ছিল ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’

গত বছরের তুলনায় বড় বাজেট

নতুন বাজেটের আকার বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশের সমান।

গত অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা পরে সংশোধন করে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়েছিল।

নির্দিষ্টকরণ বিলে কী রয়েছে

নির্দিষ্টকরণ বিল অনুযায়ী, সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংযুক্ত তহবিল থেকে অর্থ ব্যয়ের আইনগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিলে উল্লেখ করা হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে আইনটি কার্যকর হবে।

আইনে মোট ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকার ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয় রয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৫ কোটি টাকা এবং সংসদের ভোটে অনুমোদিত মঞ্জুরি রয়েছে ৮ লাখ ৩০ হাজার ৪১৪ কোটি টাকার বেশি।

সরকার জানিয়েছে, ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের আইনি ভিত্তি তৈরি করতেই এই বিল আনা হয়েছে।

মঞ্জুরি দাবি ও বিরোধী দলের ছাঁটাই প্রস্তাব

বাজেট অনুমোদনের আগে সংসদে ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনা ও ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এসব দাবির বিপরীতে ৪৩ জন সংসদ সদস্য মোট ১ হাজার ৩৪৩টি ছাঁটাই প্রস্তাব জমা দেন।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ৩৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যয় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান সংসদের সময় বাঁচানোর স্বার্থে সব ছাঁটাই প্রস্তাব একসঙ্গে প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সেই প্রস্তাব গ্রহণের পর অবশিষ্ট মঞ্জুরি দাবিগুলো সরাসরি ভোটে অনুমোদিত হয়। এরপর নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মাধ্যমে পুরো বাজেট চূড়ান্ত করা হয়।

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ যেসব খাতে

নতুন বাজেটে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে অর্থ বিভাগের জন্য। এ খাতে মোট বরাদ্দ ৮ লাখ ৩০ হাজার ৫৫১ কোটি টাকার বেশি।

এরপর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ পেয়েছে ৬৯ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে প্রায় ৪৯ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা।

এ ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পেয়েছে ৪৬ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগেও উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

উন্নয়ন ব্যয়ে বড় বৃদ্ধি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।

অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্য

নতুন অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি।

এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে। এ খাতে লক্ষ্য ২ লাখ ২৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্ক, রপ্তানি শুল্ক এবং অন্যান্য কর থেকেও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজেট ঘাটতি ও ঋণ পরিকল্পনা

নতুন বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে।

এ ছাড়া বিদেশি উৎস থেকে আরও ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য

গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

নতুন অর্থবছরে সরকার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

অর্থ বিলে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য পাস হওয়া অর্থ বিলে ৬৪টি সংশোধনী যুক্ত করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা।

এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়কর হার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যাংক হিসাব খোলা, সম্পত্তি নামজারি ও বণ্টননামা নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, ব্যবসায়িক বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, মার্চেন্ট হিসাব খোলা এবং ব্যবসার নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এ ছাড়া ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

এই বাজেট অনুমোদনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলো। সরকারের আশা, নতুন বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হবে।

এই খবরটি শেয়ার করুন: