গ্লুটেনমুক্ত রুটি কি সত্যিই অন্ত্রের জন্য উপকারী? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় দিন দিন বাড়ছে গ্লুটেনমুক্ত খাবারের জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে গ্লুটেনমুক্ত রুটিকে অনেকেই অন্ত্রের জন্য বেশি উপকারী বলে মনে করেন। তবে চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, কোনো খাদ্যে ‘গ্লুটেনমুক্ত’ লেখা থাকলেই সেটি সবার জন্য স্বাস্থ্যকর হবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক গ্লুটেনমুক্ত রুটি এমন উপাদান দিয়ে তৈরি হয়, যেখানে খাদ্যআঁশের পরিমাণ কম থাকে এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্য, চিনি বা সংযোজক ব্যবহার করা হয়। ফলে এসব রুটি সব মানুষের অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য সমানভাবে উপকারী নাও হতে পারে।
গ্লুটেনমুক্ত মানেই কি স্বাস্থ্যকর?
অনেকেই মনে করেন, গমের তৈরি সাধারণ রুটির চেয়ে গ্লুটেনমুক্ত রুটি বেশি পুষ্টিকর। তবে এ ধারণার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ডা. সাবিতা শ্রীবাস্তব Real Simple-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানান, বাজারের অনেক গ্লুটেনমুক্ত রুটি পরিশোধিত চালের গুঁড়া, ভুট্টার ময়দা বা ট্যাপিওকা স্টার্চ দিয়ে তৈরি হয়। এসব উপাদানে প্রাকৃতিক খাদ্যআঁশের পরিমাণ কম থাকায় অন্ত্রে বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়ার প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
তার মতে, এসব রুটিতে অনেক সময় অতিরিক্ত চিনি, সংরক্ষণকারী উপাদান এবং বিভিন্ন কৃত্রিম সংযোজকও ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অন্ত্রের জন্য খুব একটা উপকারী নয়।
তিনি আরও বলেন, যাদের সিলিয়াক রোগ নেই, তাদের জন্য শুধু গ্লুটেন বাদ দিলে অতিরিক্ত স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যায়—এমন প্রমাণ এখনো গবেষণায় নিশ্চিত হয়নি।
কারা গ্লুটেনমুক্ত রুটি খেলে উপকার পেতে পারেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত দুই ধরনের মানুষের জন্য গ্লুটেনমুক্ত খাদ্য প্রয়োজন হতে পারে।
প্রথমত, যারা সিলিয়াক রোগে আক্রান্ত। এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে গ্লুটেন শরীরে প্রবেশ করলে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং অন্ত্রের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, যাদের নন-সিলিয়াক গ্লুটেন সংবেদনশীলতা রয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তিরা গ্লুটেনযুক্ত খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, গ্যাস, পেটব্যথা বা অস্বস্তির মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন, যদিও তাদের সিলিয়াক রোগ থাকে না।
গ্লুটেন সংবেদনশীলতা নিয়ে কী বলছেন পুষ্টিবিদ?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ স্টেফানি ডান বলেন, কিছু মানুষের শরীর গ্লুটেনের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে। তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্লুটেন কমানো বা বাদ দিলে হজমের সমস্যা কিছুটা কমতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধুমাত্র নিজের ধারণার ভিত্তিতে গ্লুটেন বাদ দেওয়া ঠিক নয়। কারণ একই ধরনের উপসর্গ ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS), প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগসহ আরও অনেক পরিপাকতন্ত্রের সমস্যার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনা উচিত নয়।
অন্ত্র সুস্থ রাখতে আঁশ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ অন্ত্রের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর একটি হলো খাদ্যআঁশ। আঁশ অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে এবং নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা করে।
কিন্তু বাজারে পাওয়া অনেক গ্লুটেনমুক্ত রুটিতে আঁশের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে। ফলে শুধু গ্লুটেন বাদ দিলেই অন্ত্রের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হয় না।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, রুটি কেনার সময় প্রতি স্লাইসে পর্যাপ্ত খাদ্যআঁশ রয়েছে কি না তা দেখে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে সম্পূর্ণ শস্য (Whole Grain) দিয়ে তৈরি রুটি বেছে নেওয়া ভালো।
কেনার আগে লেবেল পড়া জরুরি
স্টেফানি ডানের মতে, অনেক গ্লুটেনমুক্ত পণ্যে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চিনি, লবণ এবং বিভিন্ন সংযোজক থাকে। তাই শুধু সামনের লেবেল দেখে নয়, উপাদানের তালিকা ও পুষ্টিগুণও ভালোভাবে পড়ে নেওয়া প্রয়োজন।
ডা. সাবিতা শ্রীবাস্তবও একই পরামর্শ দিয়ে বলেন, যদি কোনো রুটির উপাদান তালিকায় সম্পূর্ণ শস্যের পরিবর্তে শুধু স্টার্চ বা পরিশোধিত ময়দার উল্লেখ থাকে, তাহলে সেই পণ্য এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত?
গ্লুটেনযুক্ত খাবার খাওয়ার পর যদি নিয়মিত পেটব্যথা, ডায়রিয়া, পেট ফাঁপা, অতিরিক্ত গ্যাস, অকারণে ওজন কমে যাওয়া অথবা দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে নিজে থেকে খাদ্যতালিকা পরিবর্তন না করে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজনে সিলিয়াক রোগ বা অন্যান্য পরিপাকজনিত সমস্যার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা সম্ভব। সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
