এক শহর, দুই মহাদেশ: প্যারিসের লা শাপেলে ফুটবলের অনন্য মিলনমেলা

বিশ্বকাপ এলেই প্যারিস যেন নতুন এক রূপে ধরা দেয়। বিশেষ করে শহরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লা শাপেল এলাকায় ফুটবলের উন্মাদনা হয়ে ওঠে চোখে পড়ার মতো। রাস্তাঘাট, ক্যাফে, মুদি দোকান কিংবা চায়ের আড্ডা—সব জায়গার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে বিশ্বকাপ। তবে লা শাপেলের ফুটবল উৎসবের বিশেষত্ব অন্য কোথাও সহজে দেখা যায় না।
এবারের বিশ্বকাপে এলাকাটির আয়োজন ছিল আরও ব্যতিক্রমী। আগের আসরগুলোতে একটি বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা থাকলেও এবার বসানো হয়েছে দুটি বিশাল স্ক্রিন। উদ্দেশ্য একটাই—যাতে একই সময়ে ফ্রান্স এবং আফ্রিকার কোনো দেশের ম্যাচ থাকলে দর্শকরা দুটি ম্যাচই উপভোগ করতে পারেন।
এমনই এক সন্ধ্যায় এক পর্দায় চলছিল ফ্রান্স ও নরওয়ের ম্যাচ, অন্য পর্দায় মুখোমুখি হয়েছিল সেনেগাল ও ইরাক। দুটি ম্যাচ ঘিরেই ছিল সমান উচ্ছ্বাস। কেউ ফ্রান্সের গোল উদযাপন করছেন, আবার কিছুক্ষণ পরই সেনেগালের আক্রমণে করতালিতে মুখর হয়ে উঠছে পুরো এলাকা। এখানে সমর্থনের সীমারেখা অনেকটাই ভিন্ন।
এর কারণ কেবল ফুটবল নয়, বরং মানুষের পরিচয় ও ইতিহাস। লা শাপেলে বসবাসকারী বহু মানুষের শিকড় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে, যদিও তাদের জন্ম বা বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে। আবার ফ্রান্স জাতীয় দলের অনেক তারকার পারিবারিক শেকড়ও আফ্রিকায়। ফলে একদিকে তারা ফরাসি, অন্যদিকে আফ্রিকান—দুটি পরিচয়ই তাদের জীবনের অংশ।
এবারের বিশ্বকাপেও সেনেগাল দলে খেলেছেন এমন কয়েকজন ফুটবলার, যাদের জন্ম ফ্রান্সে। একইভাবে ফ্রান্সের জার্সিতে খেলছেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অসংখ্য তারকা। তাই লা শাপেলের মানুষ যখন পাশাপাশি দুটি পর্দায় ফ্রান্স ও সেনেগালের খেলা দেখেন, তখন সেটি কেবল দুটি দলের সমর্থন নয়; বরং নিজেদের দুই পরিচয়েরই উদযাপন।
এই দৃশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুতে সেনেগাল আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জয়ের পরও লা শাপেলের রাস্তায় নেমেছিল উৎসব। যদিও পরে টুর্নামেন্টে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে আফ্রিকার ফুটবল সংস্থা সেনেগালের শিরোপা বাতিল করে মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে। তারপরও সেই আনন্দে ভাটা পড়েনি। একইভাবে ফ্রান্সের জয়ও সমান আবেগে উদযাপন করেন এখানকার বাসিন্দারা।
বিশ্বকাপের আরেকটি রাতে একই ছবি দেখা গেছে। এক ম্যাচে উসমান দেম্বেলের হ্যাটট্রিক, অন্য ম্যাচে সেনেগালের পাপা গেয়ির জোড়া গোল। দুটি ম্যাচ, দুটি দল, দুটি পতাকা—কিন্তু আনন্দ যেন একটাই। লা শাপেলে কোনো একটি দেশের জয় অন্য দেশের পরাজয়ের অনুভূতি তৈরি করে না; বরং দুই পক্ষের সাফল্যই এখানে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়।
এই বাস্তবতার পেছনে রয়েছে ফ্রান্সের অভিবাসননীতি ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থা। দেশটিতে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃত হওয়ায় একজন ফুটবলারের জন্ম এক দেশে হলেও পারিবারিক শিকড়ের ভিত্তিতে অন্য দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলতে পারেন। ফলে প্যারিসে জন্ম নেওয়া অনেক ফুটবলার আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন, আবার আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অসংখ্য খেলোয়াড় ফ্রান্সের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন।
ফ্রান্স দলের বর্তমান তারকাদের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, অরেলিয়েন চুয়ামেনি কিংবা দায়ো উপামেকানোর মতো ফুটবলারদের পারিবারিক শিকড় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। তবু তারা ফরাসি ফুটবলের অন্যতম বড় মুখ।
পরিসংখ্যানও বলছে, চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বিদেশি জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ফুটবলাররা। মোট ৯৯ জন খেলোয়াড়ের জন্ম ফ্রান্সে। এর মধ্যে ২৩ জন খেলছেন ফ্রান্স জাতীয় দলে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আলজেরিয়া, যাদের ১৩ জন ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে।
এই তালিকায় অন্যতম আলোচিত নাম লুকা জিদান। কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন জিদানের ছেলে লুকার জন্ম ফ্রান্সে হলেও তিনি প্রতিনিধিত্ব করছেন আলজেরিয়ার। অন্যদিকে তার বাবা জিনেদিন জিদানের পারিবারিক শিকড় আলজেরিয়ায় হলেও তিনি ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। একটি পরিবারই যেন ফুটবলের এই দ্বৈত পরিচয়ের প্রতীক।
শুধু আলজেরিয়াই নয়, হাইতি, কঙ্গো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, তিউনিশিয়া, মরক্কো, কেপ ভার্দে, ঘানা, মিসর, কাতার এবং স্পেনের জাতীয় দলেও রয়েছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া একাধিক ফুটবলার।
এই চিত্রের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস। আফ্রিকার বহু দেশ একসময় ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। সেই সময়ের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অভিবাসনের ধারাবাহিকতা আজও দুই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে গভীর সম্পর্ক তৈরি করে রেখেছে। ফলে পরিচয় এখানে কেবল পাসপোর্টের বিষয় নয়; এটি ইতিহাস, পরিবার এবং সংস্কৃতিরও অংশ।
এ কারণেই আধুনিক ফুটবলে প্যারিসকে এখন অনেকেই নতুন প্রতিভার রাজধানী হিসেবে দেখেন। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ফুটবল একাডেমি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র। প্রতিদিন হাজারো কিশোর সেখানে নিজেদের স্বপ্ন গড়ে তোলে। কেউ ভবিষ্যতে ফ্রান্সের জার্সি পরেন, আবার কেউ বেছে নেন বাবা-মায়ের জন্মভূমির জাতীয় দল।
লা শাপেলের গল্প তাই শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এটি অভিবাসন, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের এক অনন্য মেলবন্ধনের গল্প। এখানে একই শহরে দাঁড়িয়ে দুই মহাদেশের মানুষ একই আবেগে ফুটবল উদযাপন করেন। ফ্রান্স কিংবা আফ্রিকার কোনো দেশের গোল—উল্লাসে কোনো পার্থক্য থাকে না।
প্যারিসের লা শাপেল তাই প্রমাণ করে, ফুটবল কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়েও বড় কিছু। এটি মানুষকে তার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে, ভিন্ন সংস্কৃতিকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসে এবং একই শহরে দুই মহাদেশের আত্মার সংযোগ ঘটায়।
